Showing posts with label বাঙ্গালীয়ানা. Show all posts
Showing posts with label বাঙ্গালীয়ানা. Show all posts

Monday, April 14, 2014

বাঙালিত্ব: দেশপ্রেম না ধর্ম?

- No comments

বাঙালিত্ব: দেশপ্রেম না ধর্ম?

লিখেছেন  Sharif Abu Hayat Opu

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম

১.
আমার জন্ম যশোরে। শীতের ছুটিতে মামাবাড়িতে যেতাম। যশোরের কথা মনে হতেই চোখে ভাসে একটা আলো—ভোরবেলা ছন-ঢাকা মটর গ্যারেজে বাল্ব জ্বলছে কুয়াশার চাদর ভেদ করে। আলো আমি বহু দেখেছি এরপরে। শিকাগো কিংবা নিউইয়র্কের চোখ ধাঁধানো আলোর মালা সেই টিমটিমে বাতিটিকে হারাতে পারেনি এখনও। মোহাম্মদপুর কেটেছে শৈশব। হয়ত গুলশানের রাস্তাগুলো আরো সুন্দর, বনানীর বাড়িগুলো আরো বনেদি কিন্তু আজো পৌনে দুকাঠার পোকামাকড়ের ঘরবসতিগুলোই মনকে আর্দ্র করে। মনে গেঁথে আছে সেন্ট যোসেফের বিশাল সব গাছের ছবি। হয়ত সেন্ট প্লাসিডসের গাছগুলো আরো সজীব, আরো সবুজ; কিন্তু সেগুলোর জন্য আমার মনে ব্যাকুল কোন আকুলতা নেই। মানুষ নস্টালজিক প্রাণী। সে যেখানে বেড়ে উঠেছে তার সাথে হৃদ্যতা থেকে যায় মৃত্যু অবধি। বাংলা অভিধানমতে দেশ মানে স্থান। শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটিকে মানুষ ভালোবাসে। এই ভালোবাসার নাম দেয়া যায় দেশপ্রেম। যে মানুষগুলোকে সে ছোট থেকে দেখে এসেছে তাদের জন্য টান থেকে যায় মনে। এই টানের জন্মও সেই দেশপ্রেম থেকেই।

মানুষ বাঁচে কেন? একটা স্বপ্ন নিয়ে। গরু স্বপ্ন দেখে না, তার প্রতিবেলা দু’আঁটি ঘাস আর রাতে একটা খুঁটি হলেই চলে। মানুষের চলে না। কেউ যদি মানুষ হয় তাহলে সে শুধু নিজেকে নিয়ে থাকতে পারে না। ব্যক্তিভেদে স্বপ্নের পরিসর বদলায়। সবচেয়ে যে ছোট, তার স্বপ্ন শুধুই তার সন্তানদের নিয়ে। তার চেয়ে যে বড় সে স্বপ্ন দেখে একটা গরীব বাচ্চার পড়ার খরচ দেবে। আরো যে বড়, সে স্বপ্ন দেখে গাঁয়ে কোন অভাবী লোক থাকবে না, খালের ওপরকার নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোটার জায়গায় একটা ছোট্ট ব্রিজ হবে। কেউ স্বপ্ন দেখে একটা হাসপাতালের। সামর্থ্য নেই, তবু আশা থাকে মনের কোণে। মানুষ যখন আত্মকেন্দ্রিকতার উপরে ওঠে তখন সে তার চারপাশের এলাকার জন্য, কাছেপিঠের এলাকার মানুষের জন্য কিছু করতে চায়। এ স্বপ্নগুলোর জন্ম একটা আদর্শ থেকে। এই আদর্শের নাম দেশপ্রেম।

বিশ্বায়নের এ যুগে এই আদর্শটা ক্রমেই রূপ বদলাচ্ছে। মানুষ স্বদেশ পাড়ি দিয়ে পরবাসে গিয়ে থিতু হচ্ছে ভালো থাকার লোভে, ভালো খাওয়ার লোভে, তথাকথিত উন্নত জীবনযাপনের মোহে। মাতৃভূমিতে যারা আছে তারাও মত্ত ভোগবাদী জীবনধারাতে। রাতদিন জীবনকে উপভোগের পালায় যখন হঠাৎ ছেদ পড়ে, বিবেকবোধ আত্মাকে সজোরে ধাক্কা মারে। সে মূহুর্তে বিবেককে স্তব্ধ করতে যে আত্মপ্রবঞ্চনার সাহায্য নেওয়া হয় তার নামও দেশপ্রেম বটে।

২.
ধর্মবোধ সাধারণত মানুষের আদর্শের উৎস হিসেবে কাজ করে। চার্চের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ইউরোপের মানুষেরা জেগে উঠেছিল এক সময়। অত্যাচারী-অনাচারী খ্রিষ্ট ধর্মকে তারা তাড়িয়ে দেয় আদর্শগত অবস্থান থেকে। কিন্তু আদর্শের স্থানটা খালি থাকে না কখনই। আধুনিক মননে আদর্শের শূন্যস্থান পূরণ করে জাতীয়তাবাদ। মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি মানুষের সহজাত ভালোবাসাকে পুঁজি করে ভাষা ও সংষ্কৃতি কেন্দ্রিক বিভাজন শুরু হয়। ইতিহাসকে ভেঙে গড়া হয়, স্বজাতির দুর্বৃত্তদের জাতীয় বীর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। রক্তখেকো নেপোলিয়নকে হাজির করা হয় আদর্শ ফরাসী নেতা হিসেবে। গণহত্যার দায়ে দুষ্ট অলিভার ক্রমওয়েলকে ব্রিটিশরা নির্বাচিত করে সেরা দশ ব্রিটিশদের একজনে, ভুলে যায় যে এই লোকই বিদ্রোহ দমনের নামে আইরিশ মেয়েদের মুখ চিরে দিত ক্ষুর দিয়ে। পৃথিবীর সভ্যতার দুহাজার বছরের ইতিহাসের ঐক্যের কলতানকে ছাপিয়ে ভাঙনের বাঁশি প্রবল হয়। মিলগুলোকে বলা হয় গৌণ, অমিলগুলোকে মুখ্য। দার্শনিকেরা আপন জাতিকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রমাণের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তপনায় নেমে পড়েন নির্দ্বিধায়। জর্জ অরওয়েলের ভাষায়:
Nationalism is power-hunger tempered by self-deception. Every nationalist is capable of the most flagrant dishonesty, but he is also—since he is conscious of serving something bigger than himself—unshakeably certain of being in the right.১

জাতীয়তাবাদ কী? এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকার মতে যখন কোন ব্যক্তির আনুগত্য এবং অনুরাগ সব কিছুকে ছাপিয়ে দেশের প্রতি ন্যস্ত হয় তখন সেই আদর্শকে জাতীয়তাবাদ বলে। তার মানে রাষ্ট্র যা করবে তাকে শুধু মেনেই নিলে চলবে না, তাকে আদর্শে লালনও করতে হবে। এই আদর্শের মূল যে কত গভীরে যেতে পারে তার প্রমাণ পাওয়া যায় ভিয়েতনামে আমেরিকান নৃশংসতার সমর্থকদের স্লোগানে:
"My country, right or wrong" কিংবা "America, love it or leave it."
এই স্লোগান অতীত হয়ে গেছে এমন ভাবার অবকাশ নেই। আজো এই বাংলাদেশে প্রচলিত ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র বিপক্ষে কিছু বললে তাকে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানে চলে যেতে বলা হয়।

দেশপ্রেমের মত সহজাত একটি প্রবৃত্তির দুর্বৃত্তায়ন হলো কিভাবে? জাতীয়তাবাদের হাতে দেশপ্রেম ছিনতাই হয় সেকুলার জাতিভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা পৃথিবীতে প্রবল হবার পর। রাষ্ট্রনায়করা পরিকল্পিতভাবেই দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদের সীমানা মুছে একে অপরের সমার্থক করে ফেলেছিল। কেন? কারণ দেশপ্রেম মানুষ তাড়িয়ে নেবে এমন একটা হাতিয়ার। অন্যায়কে ন্যায় বানাতে একটা আদর্শিক ভিত্তি লাগে—দেশপ্রেম সেই ভিতটা দেয়। ১৯৭১ সালে যারা পাকিস্তান নামক দেশটার প্রেমে অন্ধ ছিল তারা পাকি আর্মিদের নৃশংসতায় সাহায্য করেছে। রাষ্ট্রের আনুগত্যের সংজ্ঞায় এরাও দেশপ্রেমিক ছিল। যদি আজ বাংলাদেশ স্বাধীন না হতো—রাজাকারের বদলে এরা এখন পরিচিত হত দেশপ্রেমিক, দেশের সূর্যসন্তান হিসেবে। আর মুক্তিযোদ্ধারা বিবেচিত হতো বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী হিসেবে, কুলাঙ্গার হিসেবে। এভাবেই জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম ভাল-মন্দের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয়, নতুন একটা সীমারেখা তৈরী করে। যত অত্যাচারী শাসকই হোক না কেন, যত অন্যায় আহবানই হোক না কেন—দেশপ্রেমের দাবী হচ্ছে সে অন্যায়কে ন্যায় মেনে তার পক্ষে কাজ করা। একই কাজ হিটলার করিয়েছিল জার্মান জাতিকে দিয়ে। পিতৃভূমির উচ্চ মর্যাদার রক্ষার্থে লক্ষ মানুষের মৃত্যুও আপত্তিকর মনে হয়নি সাধারণ জার্মানদের কাছে। দেশপ্রেমের থাবা থেকে বাঁচতে পালিয়ে যেতে হয়েছে বিবেকমানদের। এই দেশপ্রেমের দোহাইয়ে পাকিরা তৈরী করে দিল শান্তিবাহিনী—মানুষ মেরে শান্তি আনতে চাইল এ বাংলায়। এই দেশপ্রেমের ডাক আমরা আজও শুনতে পাই: ‘শিক্ষা-শান্তি-প্রগতি’ যাদের মূলমন্ত্র তারা মানুষ ধরে ধরে জবাই করে দেওয়ার আহবান জানায়। যে মঞ্চ থেকে বিচারের দাবি ওঠে সেই একই মঞ্চ থেকে বিচারের রায় দিয়ে দেওয়া হয়। আকাঙ্খিত রায় না পেলে কি পরিণাম হবে তাও জানিয়ে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রাধীন আদালত অবমানিত হতে ভুলে যান। আমরা দেশপ্রেমের ঠুলি চোখে বেঁধে পুরো ব্যাপারটার প্রহসন উপেক্ষা করি।

৩.
দেশপ্রেমকে ব্যবহার করার সবচেয়ে সফল অস্ত্র—তাকে একটি ধর্ম হিসেবে গড়ে তোলা। ফরাসী সমাজতান্ত্রিক তাত্ত্বিক গুস্তাভো হার্ভে বলেছিলেন: For the patriotism of modern nations is a religion২ এ দেশেও মানুষের আবেগকে পুঁজি করে ক্ষমতালোভীরা নতুন একটি ধর্মের প্রবর্তন করেছিল—বাঙালি জাতীয়তাবাদ। সে ধর্মের দোহাই দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে উর্দুভাষীদের কচুকাটা করা হয়েছিল। পাকিরা না, বাঙালিরা করেছিল। যারা বেঁচে গিয়েছিল তাদের করা হয়েছিল খোঁয়ারে বন্দী। এখনও ঢাকার বুকে সেই ‘ক্যাম্প’গুলো সগর্বে বর্তমান। দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি অবাঙালিদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল: ‘বাঙালি হয়ে যাও’।৩ একটি ধর্ম নাযিল হতে সময় লাগে। বাঙালি ধর্ম নাযিল হয়নি, এ পৃথিবীতে, বঙ্গদেশে উৎপাদিত হয়েছিল।

প্রতিটি ধর্মের দুটি দিক আছে—বিশ্বাস, creed ও আচার-প্রথা, rituals। বাঙালি ধর্মের বিশ্বাস—বাঙালি সংষ্কৃতি এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের আনুগত্য। নামে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হলেও মূলত হিন্দু বিশ্বাস ও সংষ্কৃতিকে বেছে নেওয়া হয়েছে বাঙালি ধর্মের জন্য। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং পূর্বপুরুষে দেবীপূজার রীতি থাকায় দেশকে মা হিসেবে মেনে নিতে সমস্যা হয়নি বাঙালি মুসলিমদের। জাতীয় সঙ্গীতে গাওয়া হলো: ‘মা, তোর বদনখানি মলিন হলে...।' যে তরুণ প্রজন্ম বিজ্ঞানমনষ্ক হিসেবে গর্ব করছে তারাও ভেবে দেখে না প্রকৃতির মুখাবয়ব আছে কিনা। যা নেই তা মলিন হতে পারে কিনা। দেশাত্মবোধে সেজদা করা হলো বিশ্বমাতাকে:

ও আমার        দেশের মাটি, তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা।
তোমাতে        বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা॥

নিশ্চল প্রকৃতিকে আল্লাহর গুণাবলী দেওয়া হলো নির্দ্বিধায়:

তুমি        অন্ন মুখে তুলে দিলে,
তুমি        শীতল জলে জুড়াইলে,
তুমি যে        সকল-সহা সকল-বহা মাতার মাতা॥

কৃষক রোদে জ্বলে, পানিতে ভিজে ধান উৎপাদন করে তার পেটে লাথি মারতে হবে ধানের দাম কমিয়ে। আর বন্দনা করতে হবে অন্নদাত্রী মায়ের, আল্লাহর এক নাম যে আর-রাজ্জাক—সে কথা ভুলেও মুখে আনা যাবে না। ‘রব্বুল ‘আলামিন’ নামটা সুরা ফাতিহাতে তালা মেরে আটকে রেখে দিতে হবে, বাস্তব জীবনে গাইতে হবে মাতার জয়গান। আসলে কী রাষ্ট্র আর মা এক? মা কি বদলানো যায়? আমার দাদার ‘মা’ ভারতকে ভেঙে নতুন ‘মা’ বানাল  হয়েছিল—পাকিস্তান। আমার বাবারা নতুন মাকে আবার ভাঙলেন, এলো বাংলাদেশ। আমার বাবারা ভারত মাকে ঘৃণা করা শিখলেন, আমাদের ঘৃণা করতে শেখানো হল পাকিস্তানকে। নতুন মাকে ভালোবাসার শর্ত এটাই—আগের মাকে ঘৃণা করতে হবে। যে মা, মাটিকে রক্ষা করার জন্য প্রাণত্যাগের সংকল্প করা, সেই মায়ের উপরেই হামলে পড়তে হবে ক’দিন পরে। যে মাকে মানুষ কাটে, মানুষ জোড়া লাগায় তাকে ‘ইলাহ্‌’ হিসেবে মেনে নিতে হবে বাঙালি হতে হলে।

নানা ধর্মের মতো বাঙালি জাতীয়তাবাদ ধর্মে নানা প্রথাগত আচরণও আছে—বিমূর্ত মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে পুষ্প অর্ঘ্য দেওয়া, চেহারায় পতাকার তিলক আঁকা, মোমবাতি জ্বেলে শোক জানানো, মৃতদের উদ্দেশ্যে চিঠি লেখা কিংবা আকাশে ফানুশ ওড়ানো। এ ধর্মে আছে উৎসব—শহীদ, স্বাধীনতা কিংবা বিজয় দিবস। আছে তীর্থস্থান—শিখা অনির্বাণ, শহীদ মিনার আর স্মৃতিসৌধ। আছে উৎসর্গ—বিরুদ্ধবাদীদের জীবন, সাধারণ মানুষের জীবন। এ ধর্মে দীক্ষিতরা সোয়াব কামানো চকচকে চোখে স্লোগান দিয়ে রাজপথ কাঁপায়—‘ধরে ধরে জবাই করো’; পিছনে থাকে রাষ্ট্রের রক্ষীবাহিনী। বাঙালি ধর্মের জন্য আলাদা উপাসনালয় লাগে না, বিদ্যালয়ই আচ্ছা। শিশুরা জাতীয় পতাকাকে সালাম করে, জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে দিন শুরু করে। ‘চেতনা’ধারী নবী সেজে ধর্মগ্রন্থ লেখেন—শিশুরা তা পড়ে পাঠ্যবইয়ে, বুড়োরা সংবাদপত্রে। লিও তলস্তয় বড় চমৎকারভাবে বর্ণনা করে গেছেন পদ্ধতিটা:
In the schools, they kindle patriotism in the children by means of histories describing their own people as the best of all peoples and always in the right. Among adults they kindle it by spectacles, jubilees, monuments, and by a lying patriotic press.৪

বাঙালি ধর্মে পীরপ্রথাও বিদ্যমান। রাজনৈতিক নেতারা মুরিদদের পার্থিব স্বপ্ন দেখায়—দশ টাকার চাল, ঘরে ঘরে চাকরি, পদ্মা সেতু ইত্যাদি ইত্যাদি। পীরদের খাদেম হিসেবে থাকে মুক্তমনারা, বণিকেরা, প্রশাসনিক চাটুকারেরা। পীর এবং খাদেমদের গাড়ির বহর, বাড়ির উচ্চতা দীর্ঘ হতে থাকে। মানুষ সবই বোঝে তাও পাঁচ বছরে একবার গিয়ে ভোটের নজরানা দিয়ে আসে। ভোট কিনে পীরেরা রাষ্ট্রের মালিক বনে যায়—সুখ আর সুখ। বিদেশী গ্যাস-তেল কোম্পানির কাছে মায়ের রক্ত বিক্রির সুখ। মায়ের আকাশ মুক্ত রাখতে বিমান কেনার সুখ। সুখের আগুন থেকে বেরিয়ে আসে শেয়ার বাজার, হলমার্ক, ডেস্টিনি, কাল বেড়াল নামের কিছু স্ফুলিঙ্গ। সুখের আগুনের জ্বালানী হয় সীমান্তের মানুষ, পিলখানার সেনাকর্মকর্তা, ক্ষমতাচ্যুত পীরের অবুঝ মুরিদেরা। ১৯০৫ সালে গুস্তাভো হার্ভে যা বুঝেছিলেন তা আমরা আজো বুঝিনি:

A country of the present time is nothing but this monstrous social inequality, this monstrous exploitation of man by man.

আস্তে আস্তে পৈত্রিকসূত্রে ধর্ম পাওয়া মুসলিমরা বিশ্বাস আনে বাঙালি জাতীয়তাবাদে, সংষ্কৃতি হিসেবে তারা যেটা ধারণ করে তাকে দেখতে কখনও কখনও ইসলামের মতো লাগে বৈকি। তারপরেও হঠাৎ একদিন বাঙালি ইসলাম আর বাঙালি জাতীয়তাবাদে ঠুকোঠুকি লেগে যায়। তখন বাঙালি জাতীয়তাবাদের দীক্ষা দেয়া হয় ইসলাম শিক্ষা বই থেকে: দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।

৪.
ধর্ম হিসেবে দেশপ্রেম বড্ড একচোখা। রবীন্দ্রনাথের উপাধি ‘বিশ্বকবি’ আমরা জানি। উদ্দেশ্য—বাংলা পরীক্ষায় বেশি নম্বর। তিনি যে সীমান্তের বেড়াজাল কাটিয়ে বিশ্বমানবতার মধ্যে ঐক্যের সূত্র বাঁধতে চেয়েছিলেন সে উপলব্ধিটা আমাদের কখনোই শেখানো হলো না। দেশ বলতে যদি রাষ্ট্র ধরা হয় তবে তার উপকরণ দুটি—মাটি ও মানুষ। মাটি মানে প্রকৃতি—অবোধ নদী, মূক পাহাড়, শ্যামল সবুজ, সজীব সব না-মানুষ। এদের সবার জীবন আছে, ভাষা আছে—যদিও তা আমাদের বোধের বাইরে। দেশপ্রেম বলতে যদি আমরা বুঝি রাষ্ট্রের সীমানাকে ঘিরে ভালোবাসা তাহলে পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের বাইরের প্রকৃতিকে কি ভালোবাসতে নেই? সবই তো একই স্রষ্টার সৃষ্টি। আর যদি দেশপ্রেম বলতে আমরা বুঝি দেশের মানুষকে ভালোবাসা তাহলে প্রশ্ন আসে কেন শুধু দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হবে, কেন গোটা দুনিয়ার মানুষকে নয়? মানবিকতাকে কাঁটাতারে আবদ্ধ করার যুক্তি কী?

১৯৪৭ সালের ৮ই জুলাই জীবনে প্রথমবারের মতো ভারতে আসার পর সাইরিল রেডক্লিফকে দায়িত্ব দেয়া হল ভারত ভাগ করে দাও। তিনি টেবিলে বসে কলম চালালেন, সীমান্ত তৈরী হলো। আমার দাদাকে বলা হলো পশ্চিম দিনাজপুরের যে গ্রামটিতে তুমি বড় হয়েছ সেটা এখন ভারত। তুমি পাকিস্তানী। তল্পি-তল্পা গোটাও। এক অপরিচিত জায়গায় বসিয়ে তাকে জানানো হল এটা তোমার দেশ—একেই তোমার ভালোবাসা দিতে হবে। শৈশবের গ্রাম, গ্রামের মানুষগুলো আর তোমার আপন কেউ না। তোমাকে এখন প্রেম করতে হবে চট্টগ্রামের মানুষের সাথে যাদের একটা কথাও তুমি বোঝ না। রাষ্ট্রীয় আদেশে প্রেম। ধর্ম হিসেবে বাঙালি দেশপ্রেম যে আসলে প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রভুদের সংজ্ঞার উপরে টিকে আছে এই তথ্যটুকুই ধর্মটা মিথ্যা হবার জন্য যথেষ্ট।

আমরা বিশ্বাস করি এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা একজনই এবং এই পৃথিবীর মালিক তিনিই। আমাদের আগে বহু মানুষ এসেছিল যারা ‘দেশ আমার, মাটি আমার’ বলে মিথ্যা গর্ব করেছিল। এই দেশ, মাটি একই আছে কিন্তু সেই মানুষগুলো মাটির তলায় চলে গেছে। যখন আমরা এই পৃথিবীতে আসিনি তখন আমাদের দেশ কী ছিল? আমরা যখন মরে যাবো তখন আমাদের দেশ হবে কোনটা? মাটির তলায় কোন রাজার রাজত্ব চলে? কোন পুলিশ ডাণ্ডা মারে? কোন আদালত বিচার করে? যিনি বলছেন তিনি আগে বাঙালি পরে মুসলিম তিনি কি দেশের নেতাদের আল্লাহর উপরে স্থান দিচ্ছেন না? এই নেতাদের চরিত্র কী আমরা ভালো করে জানি না? এরা যে আমাদের আখিরাতে কেন দুনিয়াতেই জাহান্নাম দেখানোর জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে সেটা কি আমরা বুঝি না? এদের আমরা আল্লাহর চেয়েও বেশি ভালোবাসছি? এদের ক্ষমতা দখলের লোভে আমরা আমাদের জীবন বিকিয়ে দিচ্ছি? আমরা এত জেনে-বুঝেও এদের হাতের পুতুল হচ্ছি?

আমরা মুসলিমরা বিশ্বাস করি এই বাংলাদেশ না, পৃথিবীটাও না—আমাদের সত্যিকারের দেশ জান্নাত। আমরা সেই জান্নাতের জন্য কাজ করি যেখানে আমরা একদিন ছিলাম, যেখানে আমরা একদিন যেতে চাই। তাই আমরা প্রকৃতির বদলে প্রকৃতির স্রষ্টা আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ হিসেবে মেনে নিয়েছি। আমরা এই পৃথিবীর ভণ্ডদের না, মুহাম্মাদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমাদের নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছি। দুটোই আমাদের সচেতন প্রয়াস। আমরা জানি কেন এই বেছে নেওয়া। যদি এই অবস্থানকে অক্ষুণ্ণ রাখতে গিয়ে পৃথিবী থেকে চলে যেতেও হয় আমরা রাজি। পৃথিবী কখনওই আমাদের ছিলো না, সেটাকে ঘিরে স্বপ্নও তাই আমরা সাজাই না। আমরা সাধারণ মানুষের পার্থিব ও পারলৌকিক মঙ্গলের জন্য সাধ্যে যা কুলায় করতে চাই। এই মঙ্গলকামনাটাও সীমানা দিয়ে আবদ্ধ নয়। আমরা এই দেশের মানুষের জন্য যা চাই—সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যেও তাই চাই। আমাদের কাছে এটাই দেশপ্রেম। আর এই দেশপ্রেমের উদ্দেশ্য মানুষের মনোতুষ্টি নয়, একুশে পদক পাওয়া নয়—আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। আল্লাহ যেন আমাদের আবেগটাকে সৎ কাজে ব্যবহার করার তৌফিক দেন, মন্দ মানুষদের চক্রান্ত বোঝার তৌফিক দেন, ইসলাম বুঝে জীবনটাকে অর্থবহ করার তৌফিক দেন।


 ----------------------------------------------------------------------------
১ "Notes on Nationalism" (Polemic, No 1, October 1945, May 1945)
২ I.W.W. pamphlet “Patriotism and the Worker,” 1912;
৩ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল সাইট: http://www.albd.org
৪ Patriotism and Government, May 10, 1900.

Saturday, April 12, 2014

এবং শয়তান তাদের চোখে তাদের কাজকর্ম সুশোভিত করে দিয়েছে…

- No comments
“…এবং শয়তান তাদের চোখে তাদের কাজকর্ম সুশোভিত করে দিয়েছে…”
লিখেছেন ভাই
  Zim Tanvir

পহেলা বৈশাখের শুরুটা আসলে কিভাবে? কোন উৎসব হিসেবে নয়, শুরুটা হয়েছিল দিল্লীর জুলুমবাজ সম্রাট আকবরের হাতে, বাংলার প্রজাদের থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে। আসুন একটু কল্পনা করি! শুরুটা না হয় একটা খারাপ মানুষ করেছিল, একটু উৎসব হতে মন্দ কী! খেটে-খাওয়া মানুষগুলোর জন্য বছরের এই দিনে একটুখানি আনন্দ আর বিনোদন মিলবে। একটু অবকাশ, একটু বিশ্রাম, একটু বিরতি দিয়ে কাজের বাঁধন থেকে একটুখানি মুক্তি।

কিন্তু না, এই নতুন দিনে একটুখানি স্বস্তিতে আর চলছে না, এবার ঘটা করে আয়োজন করা চাই। ঘটা করে আয়োজন তো আর lame কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে হতে পারে না, চাই ভারি কোন ইস্যু, কোলকাতার দাদারা তাই লাফিয়ে পড়লেন এই নববর্ষকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশপ্রভুদের মন জয়ের পুজোয়। তাই ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এই নববর্ষের ঘটা করে উদযাপন। এটা অজানা নয়, উপমহাদেশের হিন্দু জমিদারেরা ছিল ব্রিটিশ দখলদারদের ডান হাত, আর মুসলিমরাই ছিল প্রধান শত্রু। সে যাই হোক, এই নববর্ষ নিছক অবকাশের গণ্ডি থেকে বের হয়ে প্রথমবারের মত রুপ নিল উৎসবের, জমিদারী পৃষ্ঠপোষকতায়, তাও আবার সাদা চামড়ার জয়গান গেয়ে! যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভূমির পর ভূমি দখল করে সম্পদ পাচার করেছে নিজভূমে, তাদেরই কীর্তনে সেই চাটুকার গোষ্ঠীটি নেচে-গেয়ে উঠল আবার, দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের প্রাক্কালে। আধুনিক ভাষায় এদের যুতসই প্রতিশব্দ, “রাজাকার”।

২০১৪ সাল, দুদিন পরে মানুষ নববর্ষ পালন করতে ছুটে যাবে। ভাবালু কণ্ঠে বারবার বলা হবে এই উৎসব বাঙ্গালী “শত বছরের শাশ্বত ঐতিহ্য”। একটু ভেবে দেখুন, সময়ের সাথে কিভাবে বদলে যায় একটা উৎসবের মতিগতি, ভাবগাম্ভীর্য আর ঐতিহ্য। যে নববর্ষের শুরু খাজনা আদায় নিয়ে, সে উৎসব অবকাশের গণ্ডি ছাড়িয়ে কিভাবে-কিভাবে হয়ে গেল নিজেকে বাঙ্গালী প্রমাণের মহোৎসব। হালখাতার প্রচলন না থাকলেও ব্যবসা আছে, খাজনার রীতি না থাকলেও চেতনা আছে। চিন্তায়-চেতনা-চলনে-বলনে-অন্তরে জেঁকে বসেছে পৌত্তলিকতা আর পশ্চিমা ভাবধারা, বাঙ্গালিপনার ঠাঁই হয়েছে চোয়ালজোড়ায়।

দু’দিন পর নববর্ষের নামে যা হবে, দু’শ বছর আগে কি তা হত? তখন কি হিন্দুদের মূর্তির অনুকরণে মুখোশ আর মূর্তি বানিয়ে কেউ “মঙ্গল যাত্রা” করত? নাকি আজকের দিনটি ছিল তাদের জন্য নির্লজ্জতা আর ‘চান্স নেবার দিন’? নাকি সেটি ছিল মানুষকে পান্তা-ইলিশ খাইয়ে বাঙ্গালী হবার মিছে সান্ত্বনা দিয়ে টাকা হাতাবার পবিত্র দিবস?

শয়তানের পরিকল্পনা এমনই, আপনাকে ধোঁকা দিয়ে এমন কাজে ঠেলে দেবে যার শেষে কী ভয়ানক পরিণতি আছে তা আপনি শুরুতে ভাবতেও পারবেন না। যারা আজ থেকে দু’শ বছর আগে নববর্ষ এই ভেবে পালন করেছে, “আচ্ছা কী হয় ‘ছুটির দিনে’ একটু ভালো-মন্দ খেলে-পরলে, হালকা গান-বাজনা করলে?”, তারা কি এটা ভেবেছে, এই নববর্ষকে কেন্দ্র করে হিন্দু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ব্রিটিশদের গোলামিকে শৈল্পিক রুপ দেবে? তারা কি এটা কল্পনা করেছে তাদের উত্তরসূরী কন্যারা এমন দিনে নির্লজ্জ বেশে বের হয়ে উগ্রতার বাজারে লালসার পণ্য হয়ে ঘুরে বেড়াবে? তারা কি কল্পনা করেছে তাদের অপদার্থ ব্যক্তিত্ববিবর্জিত চরিত্রহীন পুত্ররা গার্লফ্রেন্ডের মনোরঞ্জনের পেছনে পয়সা উড়িয়ে বেড়াবে? তাদের মনে কি এসেছে, এক আল্লাহতে বিশ্বাসী মুসলিমরা, যাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ) নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মূর্তি গুড়ো গুড়ো করেছিলেন আর যাদের নবী নিজ হাতে মক্কা থেকে ৩৬০টি মূর্তি অপসারণ করেছিলেন, সেই নবীর উম্মত আজকে আবার সেই মূর্তি বানাবে নিজ হাতে আর সেই মূর্তি-হাতে-মুখোশ পরে “মঙ্গল যাত্রা”র মিছিলে যোগ দেবে, যে মিছিলে প্রকৃতিপূজারী আর ভণ্ড নাস্তিকরা কল্যাণ কামনা করে আল্লাহর কাছে নয়, সূর্যের কাছে?

আদম (আঃ) এর পরে পাঁচজন পুণ্যবান মুসলিম ছিলেন, যাদের প্রতি অতিভক্তি আর শ্রদ্ধায় মানুষ মূর্তি নির্মাণ করে আর সেই পূণ্যবান মানুষগুলোর তাওহীদের আদর্শ ভুলে গিয়ে মূর্তিগুলোকেই একসময় তারা পূজো করতে শুরু করে, অথচ সেই পাঁচজন পূণ্যবান মুসলিম ছিলেন, মুশরিক ছিলেন না! আল্লাহ তাই কুরআনে বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে কেউ শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, তখন তো শয়তান নির্লজ্জতা ও মন্দ কাজেরই আদেশ করবে” [১]। কেননা, শয়তানকে কেউ জেনেশুনে অনুসরণ করে না, অনুসরণ করে তার পদাঙ্ক। আদমকে শয়তান বলেনি, তুমি আল্লাহর অবাধ্যতা করো, বলেছে অমুক গাছের ফল খাও চিরকালের রাজত্ব পাবে। তাই আমরা দেখি, “সুস্থধারার সামাজিক ছবি”র চারা থেকে জন্ম নেয় পর্নোগ্রাফি মহীরূহ ইন্ডাস্ট্রি, অথবা যার সূচনা “বাদ্যবিহীন গানের আসর” দিয়ে, তার পরিণতি গিয়ে ঠেকে নষ্টামি ভরা ডিজে পার্টি, সেখানে যুগের সাথে তাল-মিলিয়ে চলা প্রগতিশীল ছেলে-মেয়েরা হাত ধরাধরি করে মদ খেয়ে মাতলামি করে।

এদের পরিণতি কি? আল্লাহ বলেন,

“…এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব। আর এইভাবেই আমরা প্রতিদান দিই তাকে যে বাড়াবাড়ি করে ও তার প্রভুর নির্দেশাবলীতে বিশ্বাস স্থাপন করে না। আর পরকালের শাস্তি তো বেশী কঠিন এবং অধিক স্থায়ী।” [২]

যা ছিল এককালে ভালো নাস্তা বানাবার উপলক্ষ, তা আজ চক্ষু-কর্ণ-জিহবা-অন্তরের যিনার প্লেগ্রাউন্ড। যে উৎসবের শুরুটা ছিল হয়ত নিছক শ্রান্তির জন্য, সেই উৎসবে আজ নষ্ট চেতনা, শিরকী আচার এবং সুস্পষ্ট হারাম কাজের মহোৎসব। যে উৎসবের জন্ম জুলুম আর অন্যায়ের গর্ভে, যে উৎসব চাটুকার-রাজাকারদের কোলে লালিত, সে উৎসব আজ আত্মপরিচয়হীন জাতির “প্রাণের উৎসব”। যে উৎসবে বাঙ্গালি আর মুসলিমদের শত্রু ব্রিটিশদের জয়গান গাওয়া হত, সেই উৎসব আজ বাঁআলী মুসলমানেরা জাঁকজমকভাবে পালন করে সোৎসাহে।

শয়তান তার শয়তানী এজেন্ডা নিয়ে এভাবেই হাজির হয়, কখনো উৎসবের মোড়কে, কখনো বা চেতনায় বাঁধাই করে, ভেতরে থাকে আল্লাহর অবাধ্যতা। শয়তান চায় আপনাকে এ সংকীর্ণ দুনিয়ার প্রতি আপনাকে মোহগ্রস্ত করে ফেলতে, যাতে আপনি ভুলে থাকেন আগামী দিনে আপনার সাক্ষাৎ রয়েছে আপনার রবের সাথে। তার উদ্দেশ্য কিছু লোককে আল্লাহর পথে থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে, সুরে-উপমায়-ছন্দে (সূরা ইসরাঃ ৬৪)। আর এই উৎসবগুলো নিছক কিছু সেই উদ্দেশ্য সাধনে কিছু উপলক্ষ, যার দ্বারা সে মানুষকে পরকালের ব্যাপারে গাফেল করে দেয়। সে চায় এই উৎসবের দিনগুলোতে আপনি দ্বীনদারিতে একটু ঢিল দেন, হারাম কাজগুলো আপনার চোখ, গা ও মন-সওয়া হয়ে যায়, আপনার লজ্জাবোধ একটু একটু করে লোপ পায় অথবা আপনি নিজেই তার মধ্যে জড়িয়ে পড়েন। অধুনা কর্পোরেট জমিদারগোষ্ঠীগুলো আজকে কেবল তাদের প্রোডাক্ট বিক্রি করে না, আজকে তারা বিক্রি করে চেতনাও, আর আমরা বিক্রি করি নিজেদের বিবেকবোধ, আত্মা ও সত্তা, কামাই করি আগুনের ফোয়ারা।



আমার ভাই ও বোনেরা, আপনার সেই বনী ইসরাইলের সেই প্রজন্মের মত হবেন না যাদেরকে সাগরপাড়ে বিপদ থেকে উদ্ধার করার পর তারা এক মূর্তিপূজারী সম্প্রদায়কে দেখে মূসা (আঃ) কে আবদার করেছিল, “আমাদের উপাসনার জন্যও তাদের মূর্তির মতই একটি মূর্তি নির্মাণ করে দিন” [৩]। উত্তরে মূসা (আঃ) বলেছিলেন, “তোমরা বড়ই অজ্ঞ এক জাতি”।

আপনারা কি জানেন কেন আল্লাহ তাদেরকে এত বিশাল অনুগ্রহ করার পরেও তাদের মনে এমন উদ্ভট কাজ করতে ইচ্ছা হয়েছিল? এটি এজন্য যে, দীর্ঘদিন ফির’আউনের অধীনে বসবাস করার কারণে তারা পূর্বের দাসসুলভ মন-মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। তারা নিজেদেরকে নীচু এবং বিজাতীয় জাতি ও তাদের কালচারকে শ্রেষ্ঠ মনে করত। তাদের শরীর ছিল মুক্ত, কিন্তু মন ও আত্মা ছিল বন্দী। তাদের কাছে জান্নাত থেকে আগত খাবার ভালো লাগতো না, ভালো লাগতো ফির’আউনী আমলের তরিতরকারী।

কোন জাতির মন-মগজ কতটুকু দখল করা যায় সেই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় colonilizability। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাঙ্গালী জাতি প্রবলমাত্রায় colonializable এক জাতি। তাই আমরা দেখছি “স্বাধীন” হবার পরেই বাঙ্গালী জাতির বিজাতীয় কালচারের প্রতি অনুরাগ বাড়াবাড়ি রকমের বেশি! আজকে বাঙ্গালী, কালকে হিন্দুস্তানী, পরশুদিন আমেরিকান! ঠিক যেন লাঞ্চিত বনী ইসরাঈলীদের মত, যাদেরকে ফির’আউনের হাত থেকে রক্ষা করার পরেও ফির’আউনী আমলের স্বভাব-চরিত্র ছাড়তে পারেনি। যে নবী তাদেরকে মুক্তির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সেই নবীকেই তারা বারবার কষ্ট দিয়েছে। তেমনিভাবে বাংলার মাটিতে যারা কাফিরদের আদর্শ ও জীবনাচরণ গ্রহণে সবচেয়ে বিরোধিতা করে, আজকে তাদেরকে সবচেয়ে তাচ্ছিল্যের সাথে দেখা হয়।

যে কোন মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হল তাদের ঈমান, যে ঈমানের মূল্য এই দুনিয়া, আর এমন আরো হাজারো দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে কোটি গুণ বেশি। আল্লাহ এই জাতিকে সম্মানিত করেছেন ইসলামের দ্বারা। আল্লাহ এই জমিনের বুক থেকে বৌদ্ধ আর হিন্দুদের জুলুমকে উৎখাত করেছেন মুসলিমদের দ্বারা, তবু কেন তাদের মত হতে চাওয়া?



প্রিয় ভাই ও বোনেরা, বড় বড় ভাবের কথা আর বিশাল আয়োজন দেখে বিভ্রান্ত হবেন না, সুন্দর কথা শুনেই গলে যাবেন না। কেননা,

“আর এইভাবে আমরা প্রত্যেক নবীর জন্যে সৃষ্টি করেছি শত্রু -- মানুষ ও জিন-এর মধ্যেকার শয়তানদের, তারা একে অন্যকে ধোঁকা দেয়ার জন্যে চমকপ্রদ কথাবার্তা বলে…” [৪]

কালচার কালচার” করলেই কালচার হয় না, আর “কালচার” হলেও সেটাকে চোখ বন্ধ করে মানতে হয় না। মক্কার মুশরিকদের কালচার ছিল ধরে বাচ্চা মেয়েকে কবরে পুঁতে ফেলা, সেবা রাজ্যের অধিবাসীদের কালচার ছিল সূর্যের উপাসনা করা, লূত (আঃ) ক্বওমের কালচার ছিল সমকামিতা, মজার ব্যাপারে তারা এসব কাজ করতে কিছুই মনে করত না, তাদের চোখে তাদের কালচারই ছিল সঠিক! তাই আপনার চোখে কোন উৎসব যতই আকর্ষণীয়, লোভনীয় বা মোহনীয় লাগুক না কেন, হতে পারে তা দিয়ে শয়তান আপনাকে সরলপথ থেকে সরিয়ে রাখতে চায়, যেভাবে অতীতে বহু জাতি ও গোষ্ঠীকে পথভ্রষ্ট করেছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, আমি তাদের দৃষ্টিতে তাদের কর্মকান্ডকে সুশোভিত করে দিয়েছি। অতএব, তারা উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।” [৫]



একজন মুসলিমের জীবনে এর থেকে লজ্জার কিছু নেই যে ঈমান আনার পরেও সে কাফেরদের মত হবার চেষ্টা করে। হুজুগে মাতবেন না, হুজুগ হল পানিতে ভেসে থাকা ময়লা ফেনার মত “যা শুকিয়ে খতম হয়ে যায়, আর যা মানুষের উপকারে আসে তা জমিতে অবশিষ্ট থাকে”। মুসলিম হতে চেষ্টা করুন, জাতি-পরিচয়, মানচিত্রের সীমারেখা, সংস্কৃতি, সভ্যতা, ভাষা - কোনকিছুই চিরন্তন নয়, একমাত্র ইসলাম টিকে থাকবে ক্বিয়ামত পর্যন্ত, আর ইসলামকে মেনে চললে সেটির সুফল মিলবে চিরকাল।

আল্লাহর সামান্য অবাধ্যতা থেকে যেমন অসামান্য পাপরাশি জন্ম নেয়, তেমনি একটু সুবুদ্ধি, সমাজের চাপ আর মূর্খদের হাতছানিকে উপেক্ষা করে সত্যের আহবানে সাড়া দেওয়ার একটুখানি সৎসাহস আপনাকে বাঁচাতে পারে মহা-আগুন থেকে। আল্লাহ সহজ করুন।

“যারা তাদের মালিকের আহবানে সাড়া দেয়, তারা জন্য মহাকল্যাণ রয়েছে। আর যারা সাড়া দেয় না, (ক্বিয়ামতের দিন) যদি তাদের সবকিছু থাকে এবং তার সাথে আরো সমপরিমাণ, তাহলেও (আযাব থেকে বাঁচতে) তারা তা (নির্দ্বিধায়) মুক্তিপণ হিসেবে দিয়ে দিত। এরাই হবে সেসব হতভাগ্য মানুষ, যাদের হিসাব হবে খুব কঠিন! জাহান্নামই হবে ওদের নিবাস, কত নিকৃষ্ট সে নিবাস!” [৬]

--------

১ সূরা আন-নূর: ২১।

২ সূরা ত্ব-হা: ১২৬, ১২৭।
৩ সূরা আল-আ’রাফ: ১৩৮।

৪ সূরা আন’আম: ১১২।

৫ সূরা আন-নামল: ৪।

৬ সূরা আর-রাদ: ১৮

পয়লা বৈশাখ - মেকি বাঙালিত্ব বনাম ইসলাম

- No comments

পয়লা বৈশাখ - মেকি বাঙালিত্ব বনাম ইসলাম

লিখেছেন Sharif Abu Hayat Opu
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম

১.
আজ “পয়লা বৈশাখ” ওরফে “শুভ নববর্ষ”। আমাদের স্বভাবটা জানি কেমন - অন্য মানুষের জিনিসকে আমরা নিজেদের বলে চালাতে ভারি ভালোবাসি। কোথাকার কোন দিল্লির সম্রাট আকবর প্রজা শোষণের সুবিধার্থে, কৃষকদের গলায় গামছা বেঁধে উৎপাদিত ফসলের ভাগ ছিনিয়ে নিতে চালু করলো তারিখ-ই-ইলাহি। তাও যদি ব্যাপারটাতে একটু স্বকীয়তা থাকতো! মুসলিমদের হিজরি সালকে (বর্তমানে ১৪৩২) মন্ত্র পড়িয়ে, গলায় পৈতে ঝুলিয়ে করা হল সৌরবছর। সেই তারিখ-ই-ইলাহি- ই আজকের তথাকথিত বঙ্গাব্দ (বর্তমানে ১৪১৮)। এই মুঘল বাদশার চরম আক্রোশ ছিল বাংলার প্রতি। স্বাধীন বাংলাকে কব্জা করতে সে সেনাপতি মানসিংহকে ৫০টি কামান দিয়ে পাঠায়। সোনারগাঁর ঈশা খান সমানে সমানে লড়ে যান তার বিশাল বাহিনীর বিপক্ষে। শেষমেশ দন্দ্বযুদ্ধে মানসিংহকে পরাজিত করার পরেও তিনি হত্যা না করে ছেড়ে দেন। বিজয়ী বীরের মহানুভবতা দেখে মানসিংহের স্ত্রী অনেক অনুরোধ করে দিল্লিতে নিয়ে আসে ঈশা খানকে। কিন্তু সেখানে কি হল? আকবর দ্য গ্রেট ঈশা খানকে বন্দী করে ছুড়ে ফেলে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে। পরে নাকি অবশ্য মহান আকবর তার ভুল বুঝতে পেরে বাংলার সিংহপুরুষকে দয়া করে মুক্তি দেয়! এই সেই সম্রাট আকবর যে ‘দ্বীনে ইলাহি’ নামে একটি নতুন ধর্ম প্রবর্তন করেছিলো - যাতে ইসলাম ধর্মের খারাপ জিনিসগুলো বাদ দিয়ে হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মের ভালো জিনিস যোগ করা হয়েছিল! যে দিল্লিপতির হানাদার বাহিনী বার বার বাংলার মাটি লাল করেছে আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তে - তারই চালু করা ফারসি ভাষার সাল গণনাকে আমরা ‘বঙ্গাব্দ’ বলে চালিয়ে ভারী গর্ববোধ করি।

এতো গেল বছর শুরু হবার হিসেবের কথা। পয়লা বৈশাখ যাকে বাঙালি সর্বজনীন উৎসবের দাবী করা হয় তা উদযাপনের শুরুর ইতিহাস কি আমরা জানি? প্রথম ঘটা করে নববর্ষ পালন হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। ব্রিটিশরাজের বিজয় কামনা করে ১৯১৭ সালের পয়লা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করে কলকাতার হিন্দু মহল। আবার যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজলো, স্বাধীনতাকামী সুভাষ বসু ব্রিটিশ তাড়াতে আজাদ-হিন্দ ফৌজ গঠনের জন্য করতে দুনিয়া চষে বেড়াতে লাগলেন তখন হিন্দু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ১৯৩৮ সালে উৎসব করে পয়লা বৈশাখ পালন করলো আবার। পুজায় পূজায় সাদা চামড়ার প্রভুদের জন্য বিজয় কামনা করলো[1] তাইতো ইংরেজরা যখন ভারতবর্ষকে চুষেছে তখন ছিবড়াটা জুটেছে এদের কপালেই। অথচ এই ব্রিটিশরা সিপাহি বিপ্লবের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের খুন করে লাশ রাজপথের ল্যাম্পপোস্টে ঝুলিয়ে রেখেছিল দেশবাসীকে শিক্ষা দেয়ার জন্য। এরপরেও আতেঁল বুদ্ধিজীবিরা পয়লা বৈশাখের ইতিহাস জেনেশুনে গোপন করে একে বাঙালির প্রাণের অনুষ্ঠান বলে দাবী করে! এসব দালালরা জেনে রাখুক - আমরা মিরজাফরের বংশধর নই। বেঈমানি করার নাম বাঙালিয়ানা হলে সেই বাঙালিয়ানা আমাদের দরকার নেই।

২.
এরপর দেশ ভাগ হল। মাথামোটা আইয়ুব খান ইসলামের যোশে যোশে পূর্ববাংলায় রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করলো। তাতে কি লাভ হল? এপারের সুফি বাউল আর ওপারের রবীন্দ্রনাথ - দুয়ের আক্বিদা তো একই - সর্বেশ্বরবাদ; সবকিছু ঈশ্বর আর ঈশ্বরই সবকিছু। তাই গানের সুর আর ভাব বাউলদের, ভাষা রবীন্দ্রনাথের। কলকাতার জমিদারবাবু দিনে লোক ঠেঙিয়ে, রাতে বজরায় বসে যে গান লিখতেন তার নিষেধাজ্ঞায় পূর্ববাংলার চুশীল সমাজ ক্ষেপে উঠলো। এর প্রতিবাদে ১৯৬৭ সালে ছায়ানট শুরু করলো প্রকৃতিপূজার নবধারা। রবিবাবুর লেখা প্রার্থনাগীতিতে তারা কামনা করলো বৈশাখ যেন মূমুর্ষেরে দেয় উড়ায়ে।

আফসোস, আফসোস। যে অশিক্ষিত মানুষ মাজারের কাছে গিয়ে বাবা বাবা বলে ডাকতে থাকে তার ব্যাপারে না হয় একটা ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু শিক্ষিত মানুষ যখন বৈশাখকে ডাকে তখন আমার আসলেই মাথা কূটতে ইচ্ছা করে। বৈশাখের কি কান আছে? সে কি শোনে? তাকে ডাকলে কি আর না ডাকলেই বা কি? সে কি ষাঁড় যে সামনে যা পাবে শিং দিয়ে গুঁতিয়ে উড়িয়ে দেবে? সে কি লোটাস কামাল যে দেশের মূমুর্ষদের টাকা উড়িয়ে বেনামি একাউন্টে পাচার করে দেবে? সে কি সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি যে ১৪ই এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে জমা হওয়া ১০০টন আবর্জনা সাফ করবে? আরে আজকে যদি শেখ হাসিনা ঘোষণা দেয় যে এখন থেকে ১৫ই এপ্রিল নববর্ষ হবে তবেই বেচারা বৈশাখের আসা একদিন পিছিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর জ্ঞানী কোন উপদেষ্টা যদি প্রকৃতি-প্রত্যয় বিশ্লেষণ করে আবিষ্কার করে যে বৈশাখের নাম এসেছে বিশাখা থেকে, তারপর ৭২এর সংবিধানে ফেরার মত করে আবদার করে তাহলে বেচারা বৈশাখের নাম বদলে বিশাখা হয়ে যেতেও পারে; বেচারার কিছু করারও থাকবেনা। আর এই অবলা বৈশাখের আগমন উপলক্ষ্যে সব কড়া শিক্ষিত-আলোকপ্রাপ্ত মানুষেরা মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে, রাস্তায় মুখোশ আর মূর্তি নিয়ে মিছিল করে অমঙ্গল তাড়িয়ে বেড়ায়। হায় কপাল, আর এরাই বলে বেড়ায় ইসলাম নাকি আনুষ্ঠানিকতার ধর্ম! হিটলারের উপর একটা ডকুমেন্টারিতে জার্মান এক উৎসবের মিছিলের ছবি দেখেছিলাম - একদম একই রকম সব মুখোশ, পশুপাখির ডামি আর হিন্দু সোয়াস্তিকার চিহ্ন! যুগে যুগে প্রকৃতিপূজকদের এত্ত মিল হতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস হয়না!

আমরা মুসলিমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ্‌র সৃষ্ট প্রতিটি দিনই সমান। কোন দিনের নিজস্ব কোন ভাল-মন্দের ক্ষমতা নেই। আমরা কোন দিনকে “শুভ” হিসেবে নির্ধারণ করিনা। আমরা আল্লাহ্‌র ব্যাপারে বছরে প্রতিটি দিনই সুধারণা পোষণ করি - আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ্‌ আমাদের জন্য প্রতিটি দিনই মঙ্গলময় করে রেখেছেন। নববর্ষে ভালো খেলে সারাবছর ভালো খাওয়া মিলবে এই কুসংষ্কার আমাদের না। আল্লাহ্‌ আমাদের যে রিযক্‌ দিয়েছেন তা দিয়ে আমরা বছরের সব দিন সাধ্যমত ভালো খাবার খাওয়ার চেষ্টা করি, ওপারের দাদাদের মত কিপটামি করে ভাল খাবার বছরের শুরুর দিনের জন্য রেখে দেইনা।

৩.
একজন আমলা টার্নড মুফতির ফতোয়া দেখলাম, তিনি বলেছেন - নববর্ষে অনৈসলামিক অনাচার বাদ দিয়ে সেটা পালন করা জায়েজ। এই ফতোয়া ঈদের ক্ষেত্রে খাটে - কারণ এখন ঈদে বহু ইসলাম বিরোধী আচরণ ঢুকে পড়েছে কিন্তু পয়লা বৈশাখের ক্ষেত্রে কিভাবে খাটে? কিভাবে করলাম সেটা পরের কথা, পয়লা বৈশাখকে দিন হিসেবে উদযাপন করাটাই তো অনৈসলামিক! কেন? সুনানে আবু দাউদের একটি হাদিস উল্লেখ করি যা আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানি বিশুদ্ধ বলে নিশ্চিত করেছেন -

আনাস (রাঃ) বলেন, যখন রসুল (সাঃ) মদিনাতে আসলেন তখন তাদের দুটি দিনে খেলা-ধূলা করতে দেখলেন, তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন এই দু’দিন কি? তারা উত্তর দিল, আমরা অজ্ঞতার যুগে এদিনগুলোকে উদযাপন করতাম। রসুলুল্লাহ(সাঃ) বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তোমাদের এদের পরিবর্তে এমন দু’টি দিন দিয়েছেন যা এর চেয়ে উত্তম - আল আযহার দিন ও আল ফিতরের দিন।
লক্ষ্যনীয় যে এখানে রসুল (সাঃ) বলেছেন - إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَ
ইন্নাল্লাহা ক্বাদ আবদালাকুম বিহিমা মানে “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাদের বদলে”, অর্থাৎ আগে যা ছিল সেটা বদলে দিয়ে আল্লাহ্‌ নিজে দুটো দিন আমাদের উৎসবের জন্য নির্ধারিত করে দিলেন। এখানে কিন্তু রসুল(সাঃ) আগের দুটোকে অক্ষত রেখে নতুন দুটো ঈদ যোগ করেননি। যে মদিনাবাসী তাকে দুর্দিনে সাহায্য করেছিল, একটি মুসলিম রাষ্ট্রের সূচনা করেছিল, সেই মদিনাবাসীদেরও জাতীয় উৎসবকে ছাড় দেয়া হয়নি, বদলে দেয়া হয়েছিল। এর কারণ ব্যাখ্যায় শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইম্যিয়া ‘ইক্বতিদা আল সিরাতাল মুস্তাকিম’ গ্রন্থে বলেন - উৎসব ইসলামি শরিয়তের অংশ, যেহেতু মহান আল্লাহ্‌ সুরা মায়িদার ৪৮ নম্বর আয়াতে বলেন -

তোমাদের প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আমি নির্দিষ্ট শরিয়ত এবং নির্দিষ্ট মিনহাজ নির্ধারণ করেছিলাম।

এই মিনহাজের (পথ ও পন্থা) অংশ হিসেবে মুসলিম জাতির জন্য কিছু দিনকে আল্লাহ্‌ বেছে নিয়েছেন যেন সেদিন আমরা আটপৌরে জীবন থেকে মুক্তি নিতে পারি - গৎবাঁধা কাজ ফেলে আনন্দ-উল্লাস করি, খেলা-ধূলায় মাতি। সেদিনগুলোতে আমরা স্বজন আর বান্ধবদের সাথে দেখা করি, আড্ডা মারি, ভালো-মন্দ খাই। এমন দিনগুলো হল বাৎসরিকভাবে দুই ঈদের দিন এবং সাপ্তাহিকভাবে জুম’আর দিন। ইসলামের দর্শনটা কি সুন্দর লক্ষ্য করুন - আমাদের উৎসবের দিন আমরা শুধু কাছের মানুষদের সাথেই দেখা করিনা, কাছাকাছি হতে চেষ্টা করি এমন এক সত্ত্বার যাকে আমরা সব মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসি। সেই সত্ত্বাটা হলেন আল্লাহ্‌! এই জন্য আমরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ঈদের দিন জামা’আতে যাই, শুক্রবার দিন সব কাজ ফেলে মসজিদে বসে খুতবা শুনি।

বাংলা নববর্ষ যে আসলে হিন্দুদের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান তা নিয়ে কারো যদি বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে তাহলে তার জন্য উইকি থেকে কপি করে দিলাম -

পয়লা বৈশাখের দিন উল্লেখযোগ্য ভিড় চোখে পড়ে কলকাতার কালীঘাটেসেখানকার বিখ্যাত কালীমন্দিরে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ভোর থেকে প্রতীক্ষা করে থাকেন দেবীকে পূজা নিবেদন করে হালখাতা আরম্ভ করার জন্যব্যবসায়ী ছাড়াও বহু গৃহস্থও পরিবারের মঙ্গল কামনা করে দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে কালীঘাটে গিয়ে থাকেন

আমরা নির্লজ্জভাবে হিন্দুদের অনুকরণে পয়লা বৈশাখ পালন করলেও ওরা কিন্তু আমাদের ঈদকে সর্বজনীন উৎসব হিসেবে মনে করেনা। উৎসব আর ধর্ম যে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এটা আমরা কেন যেন বুঝতে চাইনা।

মোটকথা মুসলিমদের জন্য বছর বছর যা ঘুরে আসে এমন মাত্র দু’টি দিন উদযাপনযোগ্য। এর বাইরে যত দিবস পালিত হয় সবই পরিত্যাজ্য - সেটা ঈদে মিলাদুন্নবি বা ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম হোক, বাংলা/আরবি/ইংরেজি নববর্ষই হোক আর জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী বা ভালোবাসা দিবসই হোক।

দিনভিত্তিক নাটুকেপনা মুসলিমরা করেনা। ১৪ই এপ্রিলের উসিলায় পুঁজিবাদি ব্যবস্থা বাঙালিত্ব বিক্রি করে। বিক্রি করে লাল-সাদা জামা আর ইলিশ মাছ। পয়লা বৈশাখ কি আদতে আমাদের বাঙালি করে? নাকি বাঙালি হবার একটা মিথ্যা বোধ জন্ম দেয়? আমরা পড়ি ইংলিশ মিডিয়ামে (ইংরেজি মাধ্যমে না), দেখি হিন্দি সিরিয়াল, ক্রিকেট খেলায় পতাকা দোলাই পাকিস্তানের, বাসন মাজতে যাই ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ায় আর একদিন শাড়ি-পাঞ্জাবি পড়ে পান্তা খেয়ে ঢেকুর ফেলি - ভারি বাঙালি হয়ে গেছি!

আল্লাহ্‌ আমাদের মাতৃভাষা দিলেন বাংলা, কিন্তু আমরা অলিগলির কোচিং সেন্টারে স্পোকেন ইংলিশ শিখতে শিখতে বাংলা বলাটাই ভুলে গেলাম। আল্লাহ্‌ আমাদের যে দেশে জন্ম দিলেন সেই দেশকে আমাদের কাছে জাহান্নামের মত লাগে, এখান থেকে পালিয়ে গিয়ে অন্য দেশে সেটল হওয়াটাই এখন আমাদের স্বপ্ন। এই আমাদের মুখে দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদের জিগির ঝুটা আবেগ ছাড়া আর কিছুই নয়।

৪.
আচ্ছা তাহলে কি ‘পয়লা বৈশাখ’ পালন করা যাবেনা? একসাথে একজন মুসলিম ও একজন বাঙালি হওয়া যাবেনা?

আল্লাহ্‌কে স্রষ্টা ও প্রতিপালনকারী হিসেবে মেনে নিয়ে, আল্লাহ্‌কে একমাত্র সত্য ‘ইলাহ্‌’ হিসেবে স্বীকার করে মুসলিম হবার মানে নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করা। ইসলাম একটি দ্বীন - পরিপূর্ণ জীবন বিধান। আমার জীবনের সব ক্ষেত্রে আমি শয়তানের, আমার বা আমার মত অন্য কোন মানুষের ইচ্ছেমত চলবোনা, চলবো আল্লাহ্‌র ইচ্ছেমত।

যদি কোন কাজের বিষয়ে আমরা সুস্পষ্ট কোন নিষেধাজ্ঞা ক্বুর’আন এবং সহিহ হাদিস থেকে জানতে পারি তাহলে আমাদের কর্তব্য - আমরা যেটা করছি, সেটা করতে যতই ভালো লাগুক, সেটা পরিহার করতে হবে। ইসলামকে একটা জীবন-ব্যবস্থা হিসেবে বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়ে বেছে নিতে হয়। জন্মসূত্রে বাঙালি সবাই হতে পারে - এমনকি বাজারের নেড়ি কুকুরটাও, ব্ল্যক বেঙ্গল ছাগলটাও। কিন্তু Conscious choice এর মাধ্যমে ইসলামকে মেনে নিতে সবাই পারেনা। যারা পারে তারা ‘পপুলার বাজারে বাঙালিয়ানা’ ছেড়ে এমন এক জাতির অন্তর্ভুক্ত হয় যা দেশের সীমানা পেরিয়ে, কালের গন্ডী ছাড়িয়ে পুরো পৃথিবীর সর্বযুগের সকল সত্যসন্ধানী মানুষকে একত্রিত করেছে। এ জাতিটার নাম মুসলিম জাতি।

আমি বাঙালি বলে লজ্জিত নই মোটেই কিন্তু তা দিয়ে গৌরব করতে আমার মন সায় দেয়না, কারণ এতে তো আমার কোন কৃতিত্ব নেই। কিন্তু আমি একজন মুসলিম হতে পেরে গর্বিত - কারণ ‘বাঙালিত্বের’ মত এটা জন্মসূত্রে পাওয়া কোন ট্যাগ নয়। মুসলিম জাতির অন্তর্ভুক্ত হতে আমাকে কষ্ট করতে হয়েছে - জানতে হয়েছে, ভাবতে হয়েছে, মানতে গিয়ে আত্মত্যাগও করতে হয়েছে, সর্বোপরি আল্লাহ্‌র সাহায্য চাইতে হয়েছে। তাই আমি আগে একজন মুসলিম, তারপর একজন বাঙালি।

৫.
এ লেখাটা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জন করতে একজন মুসলিম ভাই হিসেবে অন্য মুসলিম ভাইদের প্রতি একটি স্মরণিকা মাত্র। হিদায়াত বা সত্য পথ সুস্পষ্ট - যার খুশি সে সেই পথে চলবে। বিভ্রান্তিও সুস্পষ্ট - যার খুশি সে তাতে নিমজ্জিত থাকবে। প্রত্যেক মানুষকেই তার স্রষ্টার সামনে দাঁড়িয়ে জবাবদিহী করতে হবে। পৃথিবীতে সে কোন পথ বেছে নিয়েছিল  তার ভিত্তিতে সে শাস্তি বা পুরষ্কার পাবে। সুতরাং যে ‘পয়লা বৈশাখ’ থেকে বেঁচে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির দিকে যেতে চায় যাক, আর যে ‘পয়লা বৈশাখ’ পালন করতে চায় সে করুক - তার হিসাব আল্লাহ্‌র সাথে হবে।

কোন ব্যক্তিকে তার প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী স্মরণ করিয়ে দেবার পরেও সে যদি তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তার কৃতকর্ম সমূহ ভুলে যায়, তবে তার অপেক্ষা অধিক সীমালঙ্ঘনকারী আর কে?  [সুরা কাহাফ, আয়াত ৫৭]
 <big/ >




[1] প্রথম মহাযুদ্ধে বাংলা বর্ষবরণ, মুহাম্মদ লুৎফুর হক দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ এপ্রিল ২০০৮